আজ মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এমএজি ওসমানী’র মৃত্যুবার্ষিকী।ক্ষণজন্মা অসীম সাহসী এই বীর ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ইন্তেকাল করেন। আজ তাঁর মৃত্যুদিনে জাতি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে সেই সর্বাধিনায়ককে, যাঁর নেতৃত্বে একটি জাতি স্বাধীনতার চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছিল।
এই বীর সেনানায়কের নাম বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরঅম্লান। সিলেটের মাটি থেকে উঠে আসা এই মহান নেতা প্রমাণ করেছিলেন দৃঢ় নেতৃত্ব, নৈতিক শক্তি ও দেশপ্রেম থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।
বঙ্গবীর এমএজি ওসমানী ১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিলেটের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, পুরো নাম আতাউল গনি ওসমানী। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও আত্মপ্রত্যয়ী। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর পেশাগত দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারত বিভাগের পর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর সামরিক জীবন ছিল শৃঙ্খলাবোধ, পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বনিষ্ঠার প্রতীক। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক কাঠামোর বৈষম্যমূলক নীতিতে তিনি ক্রমেই হতাশ হন। বাঙালির প্রতি অবিচার ও বৈষম্য তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। শেষ পর্যন্ত তিনি অবসর গ্রহণ করেন তবে দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে নিজেকে কখনো বিচ্ছিন্ন করেননি।
১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর গণহত্যা শুরু হলে সারা দেশ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার ঘোষণা এবং প্রবাসে অস্থায়ী সরকার গঠনের পর তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। তাঁর কাঁধে এসে পড়ে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব অসংগঠিত প্রতিরোধযুদ্ধকে একটি সুসংহত সামরিক কাঠামোয় রূপ দেওয়া।
তিনি যুদ্ধকে সেক্টরভিত্তিক ভাগ করেন, সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ দেন এবং প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও সমন্বয়ের ব্যবস্থা করেন। তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী একটি কার্যকর ও পরিকল্পিত শক্তিতে পরিণত হয়। গেরিলা যুদ্ধকৌশল, কৌশলগত আক্রমণ ও মনোবল বৃদ্ধির মাধ্যমে তিনি যোদ্ধাদের মধ্যে আস্থা সঞ্চার করেন।
এমএজি ওসমানীর অন্যতম কৃতিত্ব ছিল যুদ্ধ পরিচালনায় কৌশলগত দূরদর্শিতা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের জন্য প্রয়োজন সংগঠন, প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সহানুভূতি। তাঁর তত্ত্বাবধানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার হয় এবং ভারতসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন জোরালো হয়।
তিনি কখনো আবেগ দিয়ে নয়, বরং বাস্তবতা ও সামরিক কৌশল দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন। তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী ডিসেম্বরের চূড়ান্ত অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের মাধ্যমে পরিণতি পায়।
স্বাধীনতার পর তিনি শুধু একজন সেনানায়ক হিসেবেই নয়, একজন নীতিবান রাজনীতিক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তবে ক্ষমতার রাজনীতিতে তিনি ছিলেন নির্লিপ্ত ও আপসহীন। তাঁর কাছে দেশ ও জনগণের স্বার্থ ছিল সর্বাগ্রে।
তিনি সামরিক বাহিনীর পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার প্রশ্নে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। রাষ্ট্রগঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি নৈতিক নেতৃত্বের যে উদাহরণ স্থাপন করেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক।
এমএজি ওসমানী ছিলেন সাদাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন বিনয়ী, সৎ ও স্পষ্টভাষী। তিনি বিশ্বাস করতেন স্বাধীনতা শুধু ভৌগোলিক নয়, এটি নৈতিক ও সামাজিক মুক্তিরও প্রতীক। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধ ছিল সর্বোচ্চ মূল্যবোধ।
তাঁর সহযোদ্ধারা তাঁকে স্মরণ করেছেন একজন কঠোর কিন্তু মানবিক কমান্ডার হিসেবে যিনি শৃঙ্খলা বজায় রাখতেন, কিন্তু যোদ্ধাদের কষ্ট ও ত্যাগকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন।
আজ তাঁর মৃত্যুদিনে আমাদের প্রত্যয় হোক শুধু স্মরণ নয়, তাঁর আদর্শ ধারণ করাই হবে প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি। শৃঙ্খলা, সততা, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেম এই চারটি গুণই ছিল তাঁর জীবনের ভিত্তি। স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে সেই আদর্শই আমাদের পথপ্রদর্শক হয়ে থাকুক।
শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এমএজি ওসমানী।
মন্তব্য করুন