বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে আজ এক স্মরণীয় অথচ বেদনাবিধুর দিন। ৭ মার্চ ২০২৬ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি এর চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কারাবন্দিত্বের ২০তম দিবস। সময়ের দীর্ঘ দুই দশক পেরিয়ে গেলেও সেই রাতের স্মৃতি আজও অনেকের কাছে ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ের মতো প্রতিধ্বনিত হয়।
২০০৭ সালের ৭ মার্চ দেশ তখন এক অস্থির রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে আবদ্ধ। জরুরি অবস্থার কঠোর ছায়া নেমে এসেছে রাষ্ট্রজুড়ে। সেই বিভীষিকাময় রাতেই কোনো ওয়ারেন্ট, মামলা কিংবা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই গ্রেফতার করা হয় সমকালীন রাজনীতির আলোচিত তরুণ নেতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমানকে। অনেকের মতে, ১/১১-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি হয়ে ওঠেন নানা দেশি-বিদেশি শক্তির ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু।
এরপর শুরু হয় দীর্ঘ বন্দিজীবনের নির্মম অধ্যায়। পুলিশ রিমান্ড এবং কারাগারের নির্জন অন্ধপ্রকোষ্ঠে কঠোর নির্যাতনের অভিযোগে আলোড়িত হয় রাজনৈতিক অঙ্গন। টানা ৫৫৪ দিন প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় তিনি কারাগারের অন্তরালে কাটান। অবশেষে ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর একাধিক মামলায় জামিন পেয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মুক্তি পান ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতাল থেকে।
এই বন্দিজীবনের নির্মম স্মৃতি শুধু রাজনৈতিক ইতিহাসেই নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও রেখে যায় গভীর ক্ষতচিহ্ন। অভিযোগ রয়েছে, কারাগারে নির্যাতনের ফলে তাঁর মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত লাগে এবং মুক্তির পর দীর্ঘ সময় তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেননি। সেই সময় থেকে তাঁকে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিতে হয়েছে যা তাঁর জীবনের সংগ্রামী পথচলার এক বেদনাময় স্মারক হয়ে আছে।
তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সে সময় বিভিন্ন অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা হয়। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থা দেশে-বিদেশে অনুসন্ধান চালায় তাঁর আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের বিষয়ে। কিন্তু অনুসন্ধানের পরও বড় কোনো অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে তাঁর সমর্থকরা দাবি করে থাকেন। এমনকি কিছু অভিযোগ পরবর্তীতে প্রত্যাহার বা খারিজ হওয়ার ঘটনাও রাজনৈতিক আলোচনায় স্থান পায়।
গ্রেফতারের পরদিন কাফরুল থানায় একটি জিডিতে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ আনা হলেও তদন্ত শেষে উল্লেখযোগ্য সম্পদের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়। পরবর্তীতে সেই অভিযোগ প্রত্যাহারের ঘটনাও আলোচিত হয়। একইভাবে একটি চাঁদাবাজির মামলার বাদী পরবর্তীতে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন যে, তাঁকে চাপ দিয়ে অভিযোগ করানো হয়েছিল।
রাজনীতির এই উত্থান-পতনের গল্পে তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রাও ছিল ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এক দীর্ঘ পথ। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তিনি নেপথ্যে থেকে বিএনপির সাংগঠনিক কাজে যুক্ত থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়ে ওঠেন দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক। ২০০২ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি তৃণমূল রাজনীতিকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেন।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ইউনিয়ন প্রতিনিধি সম্মেলন ও তৃণমূল সভার আয়োজন করে তিনি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে নতুন সেতুবন্ধন তৈরি করেন। এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিএনপির তরুণ নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণসঞ্চার ঘটে এবং সংগঠন আরও বিস্তৃত হয়ে পৌঁছে যায় গ্রাম থেকে শহরের প্রান্তসীমায়।
এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় তারেক রহমানের নাম অনেকের কাছে সংগ্রাম, বিতর্ক ও প্রত্যাশার এক জটিল প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি সম্ভাবনার এক প্রতীক একজন সংগঠক, যিনি তৃণমূল রাজনীতিকে শক্তিশালী করার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
আজ তাঁর কারাবন্দিত্বের দুই দশক পূর্তিতে সেই ইতিহাস আবারও ফিরে আসে স্মৃতির আয়নায় যেখানে আছে রাজনৈতিক ঝড়, সংগ্রামের অধ্যায়, এবং সময়ের দীর্ঘ পরীক্ষায় টিকে থাকা এক নেতার গল্প।
মন্তব্য করুন