আজ ১০ ডিসেম্বর।মহান মুক্তিযুদ্ধের এই দিন পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত হয়েছিলো সিলেট জেলার বিশ্বনাথ উপজেলা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের তাপস্নাত সময়ে বাংলাদেশের প্রতিটি জনপদে জেগে উঠেছিল স্বাধীনতার দীপ্ত শপথ। রণাঙ্গনের সেই গৌরবময় দিনগুলোতে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী জনপদ বিশ্বনাথও পরিণত হয়েছিল অগ্নিপরীক্ষার এক মহান কেন্দ্রবিন্দুতে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো এখানকার বীর সেনানীরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দাঁড়িয়েছিলেন পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে। ইতিহাসের অনন্য সেই দিন ১০ ডিসেম্বর বিশ্বনাথের স্বাধীনতা অর্জনের অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
এই দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সুলেমান হোসেন ১২-১৩ জন সহযোদ্ধাকে নিয়ে হেলিকপ্টারযোগে এসে অবতরণ করেন সিলেট শহরের নিকটবর্তী দুরবি হাওর এলাকায়, যা বর্তমান শাহজালাল উপশহর। তাদের নামতেই চারদিক থেকে পাকসেনারা ঘিরে ধরে। শুরু হয় প্রচণ্ড গোলাগুলি। একপর্যায়ে গুরুতর আহত হন সুলেমান হোসেন তার ডান পায়ে গুলি লাগে। নির্মমতার আরেক অধ্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনী তাকে ধরে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন শেষে ১৪ ডিসেম্বর হত্যা করে। স্বাধীনতার মশাল হাতে রাখা এক অকুতোভয় সন্তানের এ ছিল আত্মোৎসর্গের শোকাবহ প্রতিচ্ছবি।
এদিন সকাল ১০টায়, বিশ্বনাথ থানার রামসুন্দর সরকারি অগ্রগামী মডেল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সমবেত মানুষ জাতীয় সংগীতের অনুরণে সাড়া দিয়ে প্রত্যক্ষ করে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলিত হয় লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা। ৫ নম্বর সেক্টরের কোম্পানি কমান্ডার, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুন নূর বিশ্বনাথকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। এই সময়ে স্থানীয় শিক্ষিত ব্যক্তিত্ব আব্দুল মুতলিব বিএসসি দায়িত্ব নেন থানা প্রশাসক হিসেবে।
অন্যদিকে, সিলেট সদর থানার জালালপুর এলাকাও মুক্ত হয় ১০ ডিসেম্বরেই। সেখানে মুক্তিবাহিনী আগে থেকেই অবস্থান নিলেও সেই দিন ছিল আনুষ্ঠানিক পতাকা উত্তোলন ও বিজয় মিছিলের প্রস্তুতির দিন। এমন সময় খবর আসে বিশ্বনাথ থানার পুলিশ সদস্যরা পালানোর চেষ্টা করছে। মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক সুবলচন্দ্র দাস দ্রুত নির্দেশ দেন সহযোদ্ধাদের; আটক করতেই হবে তাদের। কিন্তু পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয় বিশ্বনাথ থানার ১০ পুলিশ সদস্য স্বেচ্ছায় জালালপুরে এসে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর অধিনায়ক সুবলচন্দ্র দাস জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং উচ্ছ্বসিত মানুষের বিজয় মিছিল আকাশময় ছড়িয়ে পড়ে।
এদিন উপজেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে দলে দলে মানুষ ছুটে আসে সমাবেশে। চারদিক মুখরিত হয় ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনিতে। দেশের স্বাধীনতার সাথে একাকার হয়ে যায় সাধারণ মানুষের আনন্দ, আবেগ ও অদম্য প্রত্যয়। আনুষ্ঠানিকতা সামান্য বিলম্বিত হওয়ায় ১১ ডিসেম্বর দৌলতপুর গ্রামের মরহুম আব্দুর রব চৌধুরী ওরফে সমুজ মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় মহাসমারোহের বিজয় সমাবেশ। বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুন নূর, ল্যান্সনায়েক গোলাম মোস্তফা, মরমী কবি হাছন রাজা চৌহিত্র, সাবেক মন্ত্রী দেওয়ান সমশের রাজা চৌধুরী, থানা প্রশাসক আব্দুল মুতলিবসহ এলাকার গুণী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ।
এভাবেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস, রক্তঝরা আত্মত্যাগ ও জনগণের অটল ঐক্যে লেখা হয় বিশ্বনাথের স্বাধীনতার সোনালি ইতিহাস। সেই চেতনার আলোয় প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর উদযাপন করা হয় ‘বিশ্বনাথ মুক্ত দিবস’ যা কেবল একটি দিন নয়, বরং আমাদের বেঁচে থাকা স্বপ্নের প্রতীক, স্বাধীনতার এক মহাকাব্যিক স্মারক।
আজও যখন উচ্চারিত হয় ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ তখনই মনে পড়ে যায় সেই অগ্নিঝরা দিনের সংগ্রাম, সাহস আর অমলিন স্মৃতি। আমরা স্মরণ করি, স্বাধীনতা কোনোদিন সহজে আসে না এটি আসে রণাঙ্গনে লড়াই করা অগণিত বীরের আত্মত্যাগ ও অদম্য আশার শক্তিতে।
বিশ্বনাথ মুক্ত দিবস আমাদের মুক্তি, সাহস ও স্বপ্নের চিরজাগরূক প্রতীক।
মন্তব্য করুন