সিলেট নগরীর অলিগলি, প্রধান সড়ক এমনকি ব্যস্ত বাজার এলাকাগুলোতেও এখন এক অদ্ভুত ‘নিরব শাসন’ চলছে, বেওয়ারিশ কুকুরের। রাত নামলেই দলবদ্ধভাবে রাস্তায় নেমে পড়ে এরা, আর তাতে নগরবাসী পড়ছেন নতুন এক আতঙ্কে। হঠাৎ ছুটে আসা কুকুরের ভয়ে এখন অনেকেই রাতের শহর এড়িয়ে চলেন।
গত কয়েক মাস ধরে সিলেটের বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে একই অভিযোগ আসছে, কুকুরের কামড়ে আহত হচ্ছেন পথচারীরা, ছোটো শিশুরা স্কুলে যেতে ভয় পাচ্ছে, ফজরের সময় মুসল্লিরা নামাজে বের হতে সাহস পাচ্ছেন না। শুধু তাই নয়, চলন্ত মোটরসাইকেল বা রিকশার সামনে হঠাৎ ধেয়ে এসে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে এই পথ কুকুরের দল।
বর্ধমান সংখ্যা, হ্রাস পাচ্ছে নিরাপত্তা-
সিলেট সিটি করপোরেশনের হিসাবে নগরে প্রায় ৩৫ শ থেকে ৪ হাজার কুকুর রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। ২০১৯ সালে প্রায় ১৮০০ কুকুর এবং ২০২১ সালে প্রায় ২২শ’ কুকুরকে বন্ধ্যাকরণ রেভিসিন ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে, কুকুর যাতে রেভিস আক্রান্ত না হয়। কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান হয়নি। বরং দিন দিন কুকুরের সংখ্যা ও আক্রমণ দুটোই বেড়েছে।
নগরীর মজুমদারী এলাকার ব্যবসায়ী মাসুদ আহমদ সুজন বললেন, আম্বরখানা থেকে চৌকিদেখী পর্যন্ত কুকুরের উৎপাত ভয়াবহ। রাতে রাস্তায় বের হলে আক্রমণ থেকে রেহাই মেলে না। বড়বাজারের বাসিন্দা ছাদির হোসেনের অভিযোগ, অনেকে খাবার দেয় বলে কুকুরের সংখ্যা বাড়ছে। এখন কুকুর আতঙ্কে ছোট শিশুরা স্কুলে যেতে ভয় পায়।
নগরীর কুমার পাড়া এলাকার বাসিন্দা সিলেট ইলেকট্রনিক্স বিজনেস এসোসিয়েশন এর যুগ্ম সম্পাদক শাহীন আহমদ বলেন নগর জূড়ে বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রবে জনমনে আতংক বিরাজ করছে।ভোর বেলা ফজরের নামাজ পড়তে বের হলেই কুকুরের উপদ্রবে শিকার হচ্ছে মানুষ। প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় দিন দিন তা কেবল বাড়ছে।
আইনি জটিলতায় সিটি করপোরেশন-
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন,
আগে আমরা নিয়মিত কুকুর নিধন কর্মসূচি পরিচালনা করতাম। কিন্তু ২০১৪ সালে একটি প্রাণীপ্রেমী সংগঠনের রিটের পর আদালত বেওয়ারিশ কুকুর নিধনে নিষেধাজ্ঞা দেয়। পরবর্তীতে ‘প্রাণী কল্যাণ আইন ২০১৯’-এও মালিকবিহীন প্রাণী নিধন বা স্থানান্তর দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ফলে এখন আমরা কিছুই করতে পারিনা।
তিনি আরও বলেন, কুকুর পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী, তবে নিয়ন্ত্রণ না থাকলে সেটি বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শুধু ভ্যাকসিন প্রয়োগের মাধ্যমে এ সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়।
কুকুর সংরক্ষণের জন্য আলাদা আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রশ্নে ডা. জাহিদুল বলেন আমরা প্রতিমাসে শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে ২ হাজার ভ্যাকসিন সরবারাহ করছি।সরকারীভাবে কুকুর সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না করলে আমরা সিটি করপোরেশন থেকে তা করতে পারিনা।
সমাধান কোথায়?
প্রশাসন বলছে, আদালতের নিষেধাজ্ঞা তাদের কার্যত হাত-পা বেঁধে রেখেছে। অন্যদিকে নাগরিকদের ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। প্রশ্ন উঠছে, নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কি প্রশাসনের দায়িত্ব নয়?
যদি আইন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে কুকুর নিধন নিষিদ্ধ করে, তবে সেই একই মানবিকতা নাগরিকদের জীবনরক্ষার দিকেও সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
বিকল্প সমাধান হতে পারে, কুকুরের নিয়ন্ত্রিত আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা, নিয়মিত বন্ধ্যাকরণ ও টিকাদান কার্যক্রম সম্প্রসারণ, এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি। শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে নিবন্ধিত আশ্রয়কেন্দ্র থাকলে হয়তো প্রাণী ও মানুষের সহাবস্থান আরও নিরাপদ হবে।
সিলেটের কুকুর আতঙ্ক এখন নিছক একটি নাগরিক সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং আইনি সীমাবদ্ধতার জটিল এক প্রতিচ্ছবি। যতদিন পর্যন্ত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া না হবে, ততদিন নগরবাসীর রাতের নিস্তব্ধতা ভাঙবে না কুকুরের ঘেউঘেউ আর আতঙ্কিত মানুষের দীর্ঘশ্বাসে।
মন্তব্য করুন