রাজনীতিতে নির্বাসন নতুন কিছু নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ক্ষমতাসীন শাসকের কাছে সবচেয়ে বড়ো হুমকি হয়ে ওঠা নেতারাই বারবার দেশছাড়া হয়েছেন। নেলসন ম্যান্ডেলা কারাবন্দিত্বে, আয়াতুল্লাহ খোমেনি প্যারিসে, বেনজির ভুট্টো লন্ডনে, লেনিন জার্মানিতে, চার্লস দ্য গল ইংল্যান্ডে কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে অং সান সু চি গৃহবন্দিত্বে সবাই এক সময় ক্ষমতার বাইরে থেকেও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমান সেই ধারারই এক সমকালীন প্রতিনিধি।
নির্বাসন: শেষ নয়, নতুন অধ্যায়-
বিশ্ব রাজনীতিতে নির্বাসন অনেক সময় নেতার রাজনৈতিক সমাপ্তি নয়, বরং নতুন রূপে আত্মপ্রকাশের সূচনা। ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতা চার্লস দ্য গল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লন্ডনে অবস্থান করেও ফ্রান্সের জাতীয় নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনেও নির্বাসন তেমনই একটি রূপান্তরকাল।
চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গিয়ে দীর্ঘদিন অবস্থান করলেও তিনি বিএনপির নেতৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। বরং আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে দল পরিচালনা, কৌশল নির্ধারণ ও আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করেন ভৌগোলিক দূরত্ব রাজনৈতিক প্রভাবকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে না।
খোমেনি থেকে তারেক: নেপথ্য নেতৃত্বের দর্শন
ইরানের বিপ্লবী নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি নির্বাসনে থেকেও ইরানের বিপ্লবের আদর্শিক নেতৃত্ব দেন। প্যারিস থেকে পাঠানো তাঁর ভাষণ ও বার্তাই শাহবিরোধী আন্দোলনের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করেছিল।
তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান মাঠ-নেতৃত্বের বদলে নেপথ্য রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার ভূমিকা স্পষ্ট। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে মাঠে অনুপস্থিত থেকেও রাজনৈতিক ঐক্য, কৌশল ও লক্ষ্য নির্ধারণে তাঁর প্রভাবের কথা বিএনপি স্বীকার করে।
বেনজির ভুট্টো ও তারেক রহমান: উত্তরাধিকার ও নির্বাসন-
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোও একাধিকবার নির্বাসনে ছিলেন। স্বৈরশাসনের সময় লন্ডন ও দুবাইতে অবস্থান করেও পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতৃত্ব ধরে রেখেছিলেন। তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনেও উত্তরাধিকার ও নির্বাসনের মিল পাওয়া যায়।
শহীদ জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করলেও তারেক রহমান কেবল পারিবারিক পরিচয়ে থেমে থাকেননি বরং দলীয় কাঠামোয় সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছেন যা বেনজির ভুট্টোর রাজনৈতিক অভিযাত্রার সঙ্গে তুলনীয়।
ম্যান্ডেলার শিক্ষা: দমন-পীড়ন ও নৈতিক উচ্চতা-
নেলসন ম্যান্ডেলা দীর্ঘ ২৭ বছরের কারাবন্দিত্বের পর দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি হন। তাঁর রাজনৈতিক শক্তির বড়ো উৎস ছিলো প্রতিহিংসার বদলে পুনর্মিলনের দর্শন।
জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে তারেক রহমানের জাতীয় ঐক্য ও প্রতিহিংসাহীন রাজনীতির আহ্বানকে অনেক বিশ্লেষক ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে তুলনা করেন। যদিও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন, তবে দমন-পীড়নের পর ঐক্যের ডাক এই রাজনৈতিক বার্তা বিশ্ব রাজনীতিতে বারবার দেখা গেছে।
লেনিন ও নির্বাসিত বিপ্লবীদের কৌশল-
রুশ বিপ্লবের নেতা ভ্লাদিমির লেনিন দীর্ঘদিন ইউরোপে নির্বাসনে থেকেও বলশেভিক আন্দোলনের আদর্শিক কাঠামো গড়ে তোলেন। তাঁর রচনাগুলোই বিপ্লবের তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করে।
তারেক রহমানের ক্ষেত্রে ২০২৩ সালের রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা অনেকটা সেই আদর্শিক দলিলের ভূমিকা পালন করে। এটি আন্দোলনের কেবল তাৎক্ষণিক কর্মসূচি নয়, বরং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার একটি লিখিত দর্শন।
নির্বাসনের মনস্তত্ত্ব ও নেতৃত্বের পরীক্ষা:
বিশ্ব ইতিহাসে নির্বাসন নেতাদের জন্য সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষা। অনেকেই নির্বাসনে হারিয়ে গেছেন, আবার কেউ কেউ নির্বাসনকেই শক্তিতে রূপান্তর করেছেন। তারেক রহমান দ্বিতীয় ধারার অন্তর্ভুক্ত বলেই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
দেড় দশকের বেশি সময় নির্বাসনে থেকেও দলের নিয়ন্ত্রণ, সাংগঠনিক ঐক্য এবং আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ কাজ নয়। এখানেই তারেক রহমানকে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।
বাংলাদেশি বাস্তবতায় তারেক রহমান:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দলীয় কাঠামো ও ক্ষমতার চরিত্র বিবেচনায় তারেক রহমানের ভূমিকা আরও জটিল। একদিকে মামলা ও সাজা, অন্যদিকে দলীয় নেতৃত্ব এই দ্বন্দ্ব তাকে এক অনন্য রাজনৈতিক অবস্থানে নিয়ে গেছে।
বিশ্ব রাজনীতির অনেক নির্বাসিত নেতার মতোই তারেক রহমান এখনো ইতিহাসের চলমান অধ্যায় যার পূর্ণ মূল্যায়ন সময়ই করবে।
চার্লস দ্য গল, খোমেনি, ম্যান্ডেলা, বেনজির কিংবা লেনিন তাঁদের সবার জীবন প্রমাণ করে, নির্বাসন রাজনীতির শেষ কথা নয়। তারেক রহমান সেই ঐতিহাসিক ধারারই একটি সমকালীন প্রতিফলন।
তিনি সমর্থকদের চোখে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতীক, সমালোচকদের কাছে বিতর্কিত। তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই বিশ্ব রাজনীতির নির্বাসিত নেতাদের তালিকায় বাংলাদেশের অধ্যায়ে তারেক রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে উঠেছেন।
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগামী ২৫ তারিখ লন্ডন থেকে স্বদেশে ফিরছেন। বহুল আলোচিত এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে অভূতপূর্ব প্রাণচাঞ্চল্য প্রিয় নেতাকে এক নজর দেখার অপেক্ষায় সারাদেশ।
ইতিহাস সৃষ্টির মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী হতে সারাদেশ থেকে জনতার স্রোত এখন ঢাকামুখী।
পূর্বাচলের তিনশো ফিটে রচিত হতে যাচ্ছে নতুন এক ইতিহাস।
লেখক: প্রধান সম্পাদক, সাপ্তাহিক আলোর অন্বেষণ
মন্তব্য করুন