সাজন আহমদ সাজু
৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১:৪৬ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

শব্দের আলোকশিখায় জাগ্রত সৃজনের মহোৎসব- সাজন আহমদ সাজু

উপমহাদেশের সাহিত্যভুবনে এক উজ্জ্বল ইতিহাসের নাম কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ (কেমুসাস)। এটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয় কেমুসাস সময়ের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এক দ্যুতিময় স্মারক, যেখানে সৃষ্টিশীলতার আলো প্রথম জ্বলে ওঠে শব্দের প্রদীপে। সিলেটের সাংস্কৃতিক আত্মায় যে সাহিত্য শিরা বয়ে চলে, তার অনেকটাই জন্ম নিয়েছে এই কেমুসাসের প্রাঙ্গণ থেকে। প্রায় শতাব্দীর প্রাচীন এই সাহিত্য-তীর্থে একজন নবীন শব্দশ্রমিক প্রবেশ করলেই অনুভব করেন শব্দকে শাণিত করার যে অনন্ত সাধনা, তার সূচনা এখান থেকেই।

কেমুসাস সময়ের স্রোত পেরিয়ে আজও সাহিত্যিকদের আশ্রয়স্থল, মননের পাঠশালা, আর চিন্তার শেকড়। এ প্রতিষ্ঠান লেখক-সাহিত্যিকদের কাছে যেনো এক জ্ঞানের সমুদ্র, যেখানে শব্দের ভেতর দোল খায় কাব্যিক পৃথিবী, নতুন ভাবনা, নতুন স্বপ্ন। আর এই স্বপ্নযাত্রাকে আরও বর্ণময় করে তুলতেই প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় কেমুসাস বইমেলা, এক জ্ঞানের-সমাবেশ, যেখানে সাহিত্য হয়ে ওঠে উৎসব আর পাঠ হয়ে ওঠে উদযাপন।এই সময়টির জন্য অপেক্ষার প্রহরগুণে সাহিত্যবোদ্ধা থেকে শুরু করে নবীন প্রবীণ সাহিত্যপ্রেমীদের দল, যাদের কাছে কেমুসাস কেবল একটি প্রতিষ্টান নয় এটি জ্ঞান আহরণের তীর্থস্থান। যেখানে শব্দের মাঝেই স্নান করে প্রকৃতি।

প্রতিবছর যখন বইমেলার সময় ঘনিয়ে আসে, তখন কেমুসাসের আঙিনা যেনো অন্যরকম এক আবেশে মোড়া থাকে। কবি সাহিত্যিকদের মতোই প্রাঙ্গণের প্রতিটি ইট, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি করিডর যেনো অপেক্ষায় থাকে শব্দ, মানুষ, আলো আর অনুভূতির মিলনমেলায় মেতে ওঠার। বইমেলা শুরু হওয়ার আগের দিনগুলোতে আয়োজকদের উৎসাহ-উদ্দীপনা লেখক সাহিত্যিক,প্রকাশক সংস্কৃতিকর্মীদের সাথে মতবিনিময় উৎসবে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে আগ্রহের পারদে জ্বলে ওঠে অগ্নি,শুরু হয় ক্ষণ গণনা।
কেমুসাস আমাদের সকলের প্রতিষ্ঠান, সবার প্রাণবন্ত পদচারণায় মুখরিত থাকে মেলার প্রতিটি দিন।লেখক সাহিত্যিকদের মিলনমেলার উৎকর্ষ মৌসুম রাঙিয়ে দেয় কেমুসাস।

বইমেলা শুরু হওয়ার দিন, কেমুসাস পরিণত হয় বর্ণময় উৎসবে। ছোটো বড়ো নানা প্রকাশনীর স্টলে সাজানো থাকে নতুন-পুরোনো বইয়ের মেলা। পাঠকেরা স্টল থেকে স্টলে ঘুরে বেড়ায় বইয়ের সুবাসে ভিজে থাকা বাতাসে। বইয়ের পাতাগুলো যেনো নিঃশব্দে বলে ওঠে গল্প, কবিতা, আত্মজীবন, কিংবা অজানা কোনো মানুষের স্বপ্নের কথা। লেখকেরা আসেন তাঁদের সদ্য প্রকাশিত কিংবা বহু প্রতীক্ষিত গ্রন্থ নিয়ে, অনেকেই পাঠকের অনুরোধে দেন স্বাক্ষর, লেখেন দু-লাইন শুভেচ্ছা। সেই ছোট্টো আলোচনার মুহূর্তগুলো পাঠকের হৃদয়ে তৈরি করে আজীবনের স্মৃতি।

কেমুসাস বইমেলায় শুধু বই কেনা-বেচা নয়, এখানে সাহিত্যিকদের অপূর্ব মিলনমেলা ঘটে। প্রবীণ কবিরা তরুণ লেখকদের পাশে বসে জানান তাঁদের অভিজ্ঞতা, সাহিত্যচর্চার সংগ্রাম আর সময়ের উথালপাথাল গল্প। তরুণদের চোখে তখন দেখা যায় একদিন তারাও এই প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে সৃষ্টি করবে কিছু চিরকালীন, কিছু মানবিক, কিছু স্মরণীয় মুহুর্ত । সাহিত্যিকদের এই আন্তরিকতা, পুরোনো-নতুন লেখকদের সংলাপ, আর ভাবনার আদান-প্রদান কেমুসাস বইমেলাকে করে তোলে অপূর্ব এক বৌদ্ধিক উৎসব।

তবে বইমেলায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো শিশু ও তরুণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এখানে আয়োজন করা হয় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, কবিতা আবৃত্তি, কেরাত প্রতিযোগিতা ও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শিশুদের সরল আঁচড়ে ফুটে ওঠে রঙিন দুনিয়া, কখনো নদী, কখনো পাহাড়, কখনো কল্পলোক। কবিতা আবৃত্তির কোমল কণ্ঠ যখন প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে পড়ে, তখন মনে হয় বাংলা ভাষা যেনো নিজেই মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর কেরাতের ধ্বনি পরিবেশে ছড়িয়ে দেয় আধ্যাত্মিক শান্তি, মনে করিয়ে দেয় পবিত্রতার অপরূপ সৌন্দর্য।
এই সব আয়োজনের মাধ্যমে কেমুসাস শুধু বইমেলাই করে না সে গড়ে তোলে ভবিষ্যতের পাঠক, ভবিষ্যতের কবি, লেখক, শিল্পী যারা আগামী দিনের সাহিত্যকে এগিয়ে নিয়ে যাবে আরো উজ্জ্বল দিগন্তের দিকে। মানসগঠন ও মননশীলতার এই অনুপম অনুশীলন বইমেলাকে রূপ দেয় এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক আখরোজে।

বইমেলার দিনগুলোতে সন্ধ্যা নামলে কেমুসাসের আকাশে যেনো জ্বলে ওঠে আরেক রকম তারার আলো। আলোয় ঝলমলে লাইট, মানুষের ভিড়, বই হাতে ঘুরে বেড়ানো কিশোর, তরুণ-তরুণী , আর মাঝে মাঝে সাহিত্যিকের মৃদু ভাষণ সব মিলিয়ে একটি হৃদয়ছোঁয়া দৃশ্য তৈরি হয়। মনে হয়, সাহিত্য যেনো আলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। আর সেই আলোয় প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি পাঠক, প্রতিটি শিশু নিজেদের মধ্যে খুঁজে পায় নতুন সৃজনশক্তি।
এমন এক পরিবেশে দাঁড়িয়ে মনে হয় কেমুসাস বইমেলা শুধু একটি উৎসব নয় এটি এক মানসিক জাগরণ। বইমেলা আমাদের শেখায়, সাহিত্য মানুষের অন্তর্লোককে বদলে দিতে পারে। বই হতে পারে একজনের জীবন-গঠনের প্রথম শিক্ষক, আর পাঠ হতে পারে মানুষের চিন্তার মুক্তির প্রথম জানালা। কেমুসাস সেই জানালাটিকে উন্মুক্ত রাখে সবার জন্য প্রবীণ থেকে নবীন, শহর থেকে গ্রাম, পাঠক থেকে লেখক সবার জন্যই এই প্রাঙ্গণ সমান আপন।

অতীতের ধারাবাহিকতায় কেমুসাস এবার ১৯ তম বইমেলা আয়োজন করছে, পূর্বের প্রতিটি আয়োজন একটিকে ছাড়িয়ে অন্যটি হয়েছে সাফল্যের পালকে সমাদৃত তাই ১৯ তম কেমুসাস বইমেলা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে উৎসবমুখর প্রাণবন্ত আর লেখক পাঠকদের মিলনমেলায় পরিণত হবে নি:সন্দেহে বলা যায়।
কেমুসাস বইমেলা প্রতিবছর একজন সাহিত্যবোদ্ধাকে উৎসর্গ করা হয়ে থাকে যা নতুন প্রজন্মকে একটি শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি সৃজনশীলতার বহুমাত্রিক রূপে মেতে উঠতে প্রাণিত করে।কেমুসাস ১৯ তম বইমেলা উৎসর্গ করছে বাংলাসাহিত্যের শক্তিমান লেখক কবি রাগিব হোসেন চৌধুরীকে।তিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয় সাহিত্যের পুরোধাব্যক্তিত্ব, যাঁর সাহিত্যকর্মে সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলা সাহিত্য।

প্রতিবছর বইমেলা কেবল আয়োজন বাড়ায় না, বাড়ায় মানুষের আবেগও। কেমুসাসের দীর্ঘচিহ্নিত ইতিহাসে যুক্ত হয় নতুন নতুন অধ্যায়। কোনো লেখকের প্রথম বই এখানে পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার মুহূর্ত যেমন এক অমূল্য স্মৃতি, আবার কোনো শিশুর প্রথম কবিতা আবৃত্তিও হয়ে ওঠে তার জীবনের প্রথম সৃজনযাত্রার ভিত্তি।
এইভাবেই কেমুসাস বইমেলা হয়ে ওঠে সময়ের স্রোতে সাহিত্যপ্রেমীদের অনিঃশেষ আশ্রয়।
এখানে বই কেবল কাগজের পাতায় বন্দী জ্ঞান নয়
এখানে বই আলো, বই স্বপ্ন, বই স্বাধীন চিন্তা, বই মানবতার জয়গান।
১৯ তম কেমুসাস বইমেলা সফল হউক এই শুভকামনা

লেখক- প্রধান সম্পাদক, সাপ্তাহিক আলোর অন্বেষণ, সভাপতি, আলোর অন্বেষণ

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

করবো কাজ গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ- তারেক রহমান

সিলেটে ১০ দিনব্যাপী ৬ষ্ঠ আলোর অন্বেষণ বইমেলা সমাপ্ত

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান: স্বাধীনতার ঘোষক থেকে রাষ্ট্রনায়ক- সাজন আহমদ সাজু

আলোর অন্বেষণ সাহিত্য পদক-২০২৫ প্রদান অনুষ্ঠান সম্পন্ন

৬ষ্ঠ আলোর অন্বেষণ বইমেলার ৭ম দিনে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ সম্পন্ন

৬ষ্ঠ আলোর অন্বেষণ বইমেলার ষষ্ঠ দিনে স্কুল শিক্ষার্থীদের সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা

“আলোর অন্বেষণ সাহিত্য পদক ২০২৫” গবেষণায় পদক পাচ্ছেন গবেষক তাবেদার রসুল বকুল

আলোর অন্বেষণ সাহিত্য পদক ২০২৫ “আজীবন সম্মাননা” পাচ্ছেন কবি ও গবেষক দেওয়ান এ এইচ মাহমুদ রাজা চৌধুরী

৬ষ্ঠ আলোর অন্বেষণ বইমেলার চতুর্থ দিনে রচনা প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ সম্পন্ন

বেগম জিয়া স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতীক ছিলেন- মিফতাহ সিদ্দিকী

১০

৬ষ্ঠ আলোর অন্বেষণ বইমেলার দ্বিতীয় দিনে কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে আলোচনা ও কবিতা পাঠ অনুষ্ঠিত

১১

সাহিত্য সাংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধনে বইমেলা কার্যকর ও মহৎ উদ্যোগ-মিফতাহ সিদ্দিকী

১২

সিলেটে ১০ দিনব্যাপী ৬ষ্ঠ আলোর অন্বেষণ বইমেলা শুরু আগামীকাল

১৩

ম্যানচেস্টার-সিলেট ফ্লাইট অব্যাহত দাবিতে প্রবাসী বাংলাদেশী ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের স্মারকলিপি

১৪

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করলেন বদরুজ্জামান সেলিম

১৫

বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে বিএনপি মিশিগান শাখার আয়োজনে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত

১৬

বেগম জিয়া গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও মানুষের ভোটাধিকার রক্ষার এক আপসহীন প্রতীক- মিফতাহ সিদ্দিকী

১৭

বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করলেন মিফতাহ সিদ্দিকী

১৮

একুশে পদকপ্রাপ্ত ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া আর নেই

১৯

সিলেট প্রেসক্লাবের নির্বাচন সম্পন্ন: সভাপতি মুকতাবিস-উন-নূর, সম্পাদক সিরাজ

২০