বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজনীতিতে সুনামগঞ্জ ৫ আসন দীর্ঘদিন ধরেই একটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। শিল্পসমৃদ্ধ ছাতক এবং ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষা দোয়ারাবাজার উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনটি ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈশিষ্ট্যের কারণে জাতীয় রাজনীতির ওঠা-নামায় প্রভাব ফেলেছে বারবার। স্বাধীনতার পর থেকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মধ্যে পালাবদলের ইতিহাস রয়েছে এই এলাকায়, কখনো উন্নয়নমূলক প্রতিশ্রুতি, কখনো সংগঠনিক শক্তি আবার কখনো স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা সমীকরণ বদলে দিয়েছে। তবে ২০২৫ সালের আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বর্তমান প্রেক্ষাপট যেন আগের সব হিসাব-নিকাশকে ছাপিয়ে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির দুই শীর্ষ নেতার দ্বৈত জনপ্রিয়তায় দলে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা, চলছে স্নায়ু দ্বন্দ্ব।
এবারের নির্বাচনী আলোচনায় সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি উঠে আসছে, তা হলো বিএনপির দুই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী নেতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা।কেন্দ্র ঘোষিত বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন প্রাপ্ত হয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন। তিনি জেলা বিএনপির আহবায়ক এবং জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক। অপর দিকে এই আসনে মনোনয়ন দৌড়ে ছিলেন আরেক শক্তিশালী প্রার্থী সাবেক ছাত্রনেতা, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং ২০১৮ সালে দলের মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থী, সাবেক ছাতক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী।
মিজান চৌধুরী সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ সভাপতিও ছিলেন।তরুণ নেতাকর্মীদের মাঝে মিজানুর রহমান চৌধুরীর ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকায় এ অঞ্চলের তরুণ ভোটারদের পছন্দের প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন তিনি।
কেন্দ্র থেকে কলিম উদ্দিন মিলনকে প্রার্থী ঘোষণা করা হলেও দলের হাইকমান্ডের কাছে স্থানীয় নেতাকর্মীরা মিজানুর রহমান চৌধুরীকে প্রার্থী করার দাবি জানিয়ে মাঠে আছেন এখনো।
তাকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবিতে ছাতক দোয়ারাবাজারে হচ্ছে মিছিল-সমাবেশ, সড়ক অবরোধের মতো আন্দোলন। মিজান চৌধুরী রয়েছে একসময়ের সফল প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা। তৃণমূলে তাঁর নেতৃত্বের ধরনকে তরুণ ও প্রগতিশীল ভোটাররা তুলনামূলকভাবে বেশি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন।
অভ্যন্তরীণ কোন্দল যাই হউক শেষ মুহুর্তে প্রার্থী পরিবর্তন না হলে দলের মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উভয়েই।
জামায়াতের পুনর্গঠন ও ইসলামী রাজনৈতিক নেতৃত্বের উত্থান-
৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসার পর জামায়াতে ইসলামী ছাতক দোয়ারাবাজারে দ্রুত সাংগঠনিক কাজ জোরদার করেছে।
মাওলানা আবদুস সালাম আল মাদানী দলের একক প্রার্থী হিসেবে বহুদিন আগে থেকেই নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। ভোটারদের ঘরে ঘরে গিয়ে ধারাবাহিক প্রচারে তিনি ইসলামি ভোটব্যাংকের বড়ো অংশ নিজের দিকে টেনে নিতে পেরেছেন বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি ইসলামী রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন মাওলানা সাদিক সালীম, তিনি খেলাফত মজলিস মনোনীত রিকশা মার্কার প্রার্থী। তিনি ইসলামী ছাত্র সংগঠনের সাবেক নেতৃত্ব হিসেবে দেশব্যাপী পরিচিত। তরুণদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা তুলনামূলকভাবে অন্যদের চেয়ে বেশি। ধর্মীয় আলোচক ও বক্তা হিসেবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা গ্রামীণ ভোটারদেরও কাছে তাকে আকর্ষণীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে।
এ তালিকায় আরও রয়েছেন ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের সহ সেক্রেটারি মাওলানা আলী আকবর, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম থেকে মোহাম্মদ নুরুল হক, এবং খেলাফত মজলিসের মাওলানা আব্দুল কাদির।
দলীয় প্রার্থী ছাড়াও এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জাহাঙ্গীর আলম।।তিনি দীর্ঘদিন ধরে স্বতন্ত্রভাবে মাঠে কাজ করছেন। দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা সহায়তা, সামাজিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগ এবং শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যতিক্রমধর্মী কাজের কারণে তিনি ইতোমধ্যেই সাধারণ মানুষের সমর্থন অর্জন করেছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে থেকে তাঁর এ প্রভাব আসন্ন নির্বাচনে স্বতন্ত্র ভোটকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দাঁড় করাতে পারে।
গণ-অধিকার পরিষদ, এবি পার্টি ও এনসিপির মতো দলগুলো ছাতক ও দোয়ারাবাজারে কার্যত কোনো রাজনৈতিক সক্রিয়তা তেমন চোখে পড়ছে না।
ভোটারদের মনস্তত্ত্ব:
পরিবর্তন, সততা ও মুক্ত পরিবেশের প্রত্যাশা
স্থানীয় জনগণের ভাষ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট গত দেড় দশক ধরে প্রকৃত অর্থে ভোটাধিকার প্রয়োগের অভাব তাদের মধ্যে পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে।
তরুণ ভোটাররা বিশেষভাবে সচেতন।
দুর্নীতি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, মাদকসংযোগ এ ধরনের কোনো অভিযোগ থাকা প্রার্থীকেই তারা প্রত্যাখ্যান করতে প্রস্তুত।
সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য, সৎ ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির প্রার্থীই এবার বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন।
এই পরিবর্তিত মনস্তত্ত্ব প্রার্থীদেরও বাধ্য করছে তৃণমূলের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক স্থাপন, মানুষের পাশে থাকা এবং সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামতে।
উত্তপ্ত ও অনিশ্চিত এক নির্বাচনী অধ্যায়
সব দিক বিবেচনায় সুনামগঞ্জ ৫ আসন এখন জাতীয় রাজনীতির একটি অত্যন্ত আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। বিএনপির দুই প্রবল প্রার্থী, জামায়াতের উত্থান, ইসলামী নেতৃত্বের বহুমাত্রিক সক্রিয়তা, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য স্বতন্ত্র প্রার্থীর উপস্থিতি সব মিলিয়ে এই আসনে নির্বাচন একটি বহুস্তরীয় প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে।
কে শেষ পর্যন্ত জনগণের আস্থা অর্জন করবেন, কোন রাজনৈতিক শক্তি এখানে নেতৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা বা পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হবে তা এখনো অনিশ্চিত।
মন্তব্য করুন