কিছু মানুষ আছেন যারা কেবল নিজের জীবন গড়েন না, বরং সময়ের কাঁধে ভর করে সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণে নেমে পড়েন। যাদের চিন্তা ব্যক্তিগত সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিস্তৃত হয় মানুষ, নগর আর রাষ্ট্রের কল্যাণে। সিলেটের এমনই এক আলোকিত নাম ড. মোস্তফা আহমেদ মোশতাক, রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক, শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক, সর্বোপরি একজন মানবিক মানুষ।
শিকড় থেকে আলো:
১৯৬৫ সালে সিলেট জেলার ঐতিহ্যবাহী বিশ্বনাথ উপজেলার চরচণ্ডি গ্রামে জন্ম মোস্তফা আহমেদ মোশতাকের। এক সম্ভ্রান্ত ও সমাজসেবামুখী পরিবারেই তাঁর বেড়ে ওঠা। পিতা মরহুম আলহাজ্ব আব্দুর রউফ ছিলেন দৌলতপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান যিনি জনপ্রতিনিধিত্বকে দেখেছিলেন সেবার দায়িত্ব হিসেবে। জিন্দাবাজারে প্রতিষ্ঠিত তাঁর সুলভ বস্ত্রালয় ছিল শুধু ব্যবসা নয়, মানুষের আস্থার জায়গা। মাতা মরহুমা পিয়ারা বেগম ছিলেন নীরব প্রেরণা যাঁর সহানুভূতি ও উৎসাহ সমাজসেবার বীজ বপন করে সন্তানের হৃদয়ে।
শিক্ষার পথে, শৃঙ্খলার আলোয়:
সিলেট শহরের ঐতিহ্যবাহী এইডেড হাই স্কুল থেকে ১৯৮৩ সালে এসএসসি অর্জনের মধ্য দিয়ে শুরু তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা-যাত্রা। স্কুলজীবনেই স্কাউট ও সি-স্কাউট আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের শিক্ষা নেন। ট্রাফিক সপ্তাহে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল শৃঙ্খলা ও সেবার এক বাস্তব পাঠ।
পরবর্তীতে এমসি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং সিলেট-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চতর জ্ঞান ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আকাঙ্ক্ষায় ১৯৮৯ সালে পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে যা তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
প্রবাসে জ্ঞান, আইনে দক্ষতা:
ব্রিটেনে অধ্যয়নকালীন তিনি একের পর এক উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন ইন্স্যুরেন্স ও ফাইন্যান্স, সুপারভাইজরি ম্যানেজমেন্ট, ইয়ুথ অ্যান্ড কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট, ইমিগ্রেশন ল, এলএলবি অনার্স। বর্তমানে তিনি বিপিপি ইউনিভার্সিটিতে ব্যারিস্টার ট্রেনিং ও ল’ বিষয়ে মাস্টার্স অধ্যয়নরত। এই বহুমাত্রিক শিক্ষা তাঁকে কেবল পেশাজীবী নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের কার্যকর সৈনিক করে গড়ে তোলে।
রাজনীতি মানে প্রতিবাদ ও দায়িত্ব:
রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি ছাত্রজীবনেই। এমসি কলেজে অধ্যয়নকালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে আদর্শগত কারণে দলীয় অবস্থান পরিবর্তন করলেও গণতন্ত্র, ন্যায় ও অধিকার প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন।
ব্রিটেনে বসেও তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। বিএনপির লন্ডন শাখায় নেতৃত্ব, এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অনশন, মিছিল, সমাবেশ সবখানেই তাঁর সরব উপস্থিতি ছিল। যুক্তরাজ্য ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব পালন করে প্রবাসী তরুণদের রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেন।
গণমাধ্যমে দায়িত্বশীল কণ্ঠ:
ড. মোশতাক কেবল রাজনীতির মানুষ নন, তিনি সচেতন গণমাধ্যমকর্মীও। প্রবাস বার্তা ২৪ ডটকম-এর প্রধান সম্পাদক, পিবি অনলাইন টিভি, চ্যানেল এস গ্রেটার ম্যানচেস্টার ও এটিএন বাংলায় তাঁর কাজ প্রবাসী কমিউনিটির কথা তুলে ধরেছে বৃহত্তর পরিসরে।
যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক ও সমাজসেবামূলক সংগঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনের পাশাপাশি ডক্টর এম এ মোশতাক পরিচালক-অ্যাকশন টুগেদার, নির্বাহী পরিচালক ও প্রশিক্ষক- টাইগার্স ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশনের (টিআইএ), প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক- হাইড ক্রেডিট ইউনিয়ন, প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হাইড মিলেনিয়াম ট্রাষ্ট, আহবায়ক – প্রবাসী বাংলাদেশী ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন, ও আহবায়ক – বঙ্গবীর ওসমানী স্মৃতি পরিষদ ।
তরুণদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ:
২০০৫ সাল থেকে তিনি তরুণ সমাজকে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, আইনগত জ্ঞান ও পেশাগত দক্ষতায় গড়ে তুলতে নিরলস কাজ করছেন। সিলেটের প্রাণকেন্দ্র জিন্দাবাজারে প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম ল চেম্বার শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয় এটি অসহায় মানুষের আইনি আশ্রয়স্থল।
সিলেট, আগামী শতাব্দীর স্বপ্ন
২০২৩ সালে সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি একটি সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন উপস্থাপন করেন পরিকল্পিত নগর, মানবিক প্রশাসন, আধুনিক শিক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের সিলেট। জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে উঠে এই ভাবনাই তাঁকে আলাদা করেছে।
অর্জিত স্বীকৃতি:
২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ও পাবলিক সার্ভিসে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অফ বিজনেস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস। এটি কেবল একটি স্বীকৃতি নয় একটি দীর্ঘ মানবিক যাত্রার আন্তর্জাতিক স্বাক্ষর।
ব্রিটেনের বাংলাদেশী কমিউনিটিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ও প্রবাসীদের দাবি-দাওয়ার বিভিন্ন বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ডক্টর এম এ মোশতাক কে “প্রবাসী সম্মাননা- ২০২৫” প্রদান করা হচ্ছে।
মানুষের পাশে থাকা এক জীবন:
৩০ বছরের বেশি সময় ধরে কমিউনিটি নেতৃত্ব, শিক্ষা সহায়তা, আইনগত পরামর্শ, সামাজিক সংহতি সবখানেই ড. মোস্তফা আহমেদ মোশতাকের উপস্থিতি দৃঢ় ও মানবিক। তাঁর লেখা বইগুলো বাংলাদেশী ইন গ্রেট ব্রিটেন, নিরবতা আমাকে কাঁদায়, দেশ আমার মাটি আমার সময়ের দলিল হয়ে আছে।
ড. মোস্তফা আহমেদ মোশতাক এমন একজন মানুষ, যিনি বিশ্বাস করেন রাষ্ট্র গড়ে ওঠে মানুষের হাত ধরেই। শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও মানবিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে যেকোনো রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে তিনি সক্ষম। তাঁর জীবনগাথা প্রমাণ করে আলোকিত মানুষ কখনো একা হাঁটেন না, তিনি পথ দেখান।
সিলেটের ভবিষ্যৎ, প্রবাসী কমিউনিটির আশা আর তরুণদের স্বপ্ন সবখানেই তাই আজও উচ্চারিত হয় এই নাম।
মন্তব্য করুন