অন্বেষণ ডেস্ক
৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ৫:১০ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

বেগম খালেদা জিয়া বিদায়: এক মহাকাব্যের অনন্তকালের পথে অসীম যাত্রা

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস বলে, সব নেতা ক্ষমতায় থেকে স্মরণীয় হন না। কেউ কেউ স্মরণীয় হন দীর্ঘ সংগ্রাম, নির্যাতন, অবরুদ্ধ জীবন আর আপসহীন অবস্থানের মধ্য দিয়ে। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন সেই বিরল ধারার নেত্রী, যিনি ক্ষমতার চেয়েও আদর্শকে বড়ো করে তুলেছিলেন।

তাঁর বিদায়ের দিনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে যে লাখো মানুষ নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁরা শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানাননি, তাঁরা বিদায় জানিয়েছেন এক সংগ্রামী রাজনৈতিক যুগকে। মানুষের সেই নীরবতা ছিলো গর্জনের মতো গভীর। এই দৃশ্য স্মরণ করিয়ে দেয় দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলার মুক্তির সময়ের আবেগ, পাকিস্তানে বেনজির ভুট্টোর জানাজায় মানুষের ঢল কিংবা লাতিন আমেরিকায় ইভা পেরনের বিদায়ে জনসমুদ্রের কথা।
নেলসন ম্যান্ডেলার মতোই খালেদা জিয়াও কারাগারকে ভয় করেননি। ম্যান্ডেলা যেমন ২৭ বছরের বন্দিত্বেও আপস করেননি, তেমনি খালেদা জিয়াও বারবার কারাবরণ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, অবমাননা ও নিঃসঙ্গতা সহ্য করেও নিজের অবস্থান থেকে সরে যাননি। পার্থক্য ছিল শুধু ভূগোলের, সংগ্রামের ভাষা ছিলো একই।

বেনজির ভুট্টোর সঙ্গে তাঁর তুলনা আরও গভীর। বেনজির যেমন নির্বাসন ও মৃত্যুঝুঁকি জেনেও গণতন্ত্রের আহ্বান নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন, খালেদা জিয়াও তেমনি জানতেন এই পথে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নেই, আছে কেবল দায়িত্ব। দুজনই পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করেছেন, নেতৃত্ব লিঙ্গনির্ভর নয়, নেতৃত্ব চরিত্রনির্ভর।
মার্গারেট থ্যাচার কিংবা গোল্ডা মেয়ার ছিলেন রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতীক। আর খালেদা জিয়া ছিলেন প্রতিরোধের প্রতীক। এই দিক থেকে তিনি থ্যাচারের চেয়ে কম কঠোর নন, আবার ম্যান্ডেলার মতোই মানবিক সমর্থনের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
বিশ্ব ইতিহাসে দেখা যায়, যেসব নেতা দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থেকেও মানুষের হৃদয়ে প্রভাব ধরে রাখেন, তারাই প্রকৃত অর্থে গণমানুষের নেতা। ভারতের জয়প্রকাশ নারায়ণ, চেক প্রজাতন্ত্রের ভাক্লাভ হাভেল কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যান্ডেলা, এই তালিকায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়ার নাম অনিবার্যভাবে যুক্ত হয়।
টানা ৪৩ বছর একটি দলের নেতৃত্বে থাকা কেবল সাংগঠনিক দক্ষতার প্রমাণ নয়, এটি মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসার প্রতিফলন। বহুবার তাঁকে রাজনৈতিকভাবে একঘরে করার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের সমর্থন তাঁকে কখনো নিঃসঙ্গ হতে দেয়নি। এটাই তাঁকে আন্তর্জাতিক সংগ্রামী নেতৃত্বের কাতারে স্থায়ী আসন দেয়।

তাঁর মৃত্যুতে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্ব রাজনীতিও নীরব হয়ে আসে। জাতিসংঘ গভীর শোক প্রকাশ করে তাঁকে স্মরণ করেছে একজন গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও রাজনৈতিক নেতারা শোকবার্তায় শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশন শোক প্রকাশ করেছে, অনেক দেশের প্রতিনিধিরা সরাসরি ঢাকায় এসে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। এই আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে খালেদা জিয়া কেবল একটি দেশের রাজনীতির অংশ ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিশ্ব গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক পরিচিত নাম।

দেশের ভেতরেও রাজনৈতিক বিভাজন তাঁর মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। সরকার এবং অন্যান্য সব রাজনৈতিক দল শোক প্রকাশ করে। প্রধান উপদেষ্টা গভীর শোক জানিয়ে বলেছেন, জাতি একজন অভিজ্ঞ ও সংগ্রামী নেতৃত্বকে হারালো। তাঁর মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়, জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয় এবং এক দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বকেই প্রতিফলিত করে।
অপরদিকে সারাদেশ থেকে দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষ দলে দলে জানাজায় অংশ নেয়। বৃদ্ধের চোখে জল, তরুণের কণ্ঠে চাপা কান্না, নারীর নীরব দীর্ঘশ্বাস, সব মিলিয়ে এক শোকের মাতমে রূপ নেয় বিদায়ের মুহূর্ত। চোখের জলে মানুষ তাঁকে বিদায় জানিয়েছে, যেন নিজের পরিবারের কাউকে হারিয়েছে। সেই শোক ছিলো নিঃশব্দ, কিন্তু গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী।
শেষ জীবনেও তাঁকে স্বস্তি দেওয়া হয়নি। বিশ্ব রাজনীতির বহু সংগ্রামী নেতার মতোই, যাদের জীবন শেষ হয় অবহেলা ও বঞ্চনার বাস্তবতায়, খালেদা জিয়াও তেমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। তবুও তিনি ইতিহাসের কাঠগড়ায় নীরব অভিযোগ হয়ে থাকবেন না, তিনি থাকবেন দৃঢ় উপস্থিতি হয়ে।
তাঁর জানাজায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি তাই কেবল আবেগ নয়, এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা। বার্তাটি স্পষ্ট, ক্ষমতা যায়, আদর্শ থাকে। শাসন বদলায়, কিন্তু সংগ্রামের স্মৃতি মুছে যায় না।
আজ তিনি নেই। কিন্তু যেমন ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার বিবেক, বেনজির পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক স্মৃতি, ঠিক তেমনি খালেদা জিয়া হয়ে থাকবেন বাংলাদেশের আপসহীন গণতান্ত্রিক চেতনার নাম।
একজন নেত্রী বিদায় নিলেন। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতির দীর্ঘ সংগ্রামের মানচিত্রে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি দৃঢ়, স্পষ্ট রেখা এঁকে দিয়ে গেলেন-
যার নাম খালেদা জিয়া।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

করবো কাজ গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ- তারেক রহমান

সিলেটে ১০ দিনব্যাপী ৬ষ্ঠ আলোর অন্বেষণ বইমেলা সমাপ্ত

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান: স্বাধীনতার ঘোষক থেকে রাষ্ট্রনায়ক- সাজন আহমদ সাজু

আলোর অন্বেষণ সাহিত্য পদক-২০২৫ প্রদান অনুষ্ঠান সম্পন্ন

৬ষ্ঠ আলোর অন্বেষণ বইমেলার ৭ম দিনে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ সম্পন্ন

৬ষ্ঠ আলোর অন্বেষণ বইমেলার ষষ্ঠ দিনে স্কুল শিক্ষার্থীদের সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা

“আলোর অন্বেষণ সাহিত্য পদক ২০২৫” গবেষণায় পদক পাচ্ছেন গবেষক তাবেদার রসুল বকুল

আলোর অন্বেষণ সাহিত্য পদক ২০২৫ “আজীবন সম্মাননা” পাচ্ছেন কবি ও গবেষক দেওয়ান এ এইচ মাহমুদ রাজা চৌধুরী

৬ষ্ঠ আলোর অন্বেষণ বইমেলার চতুর্থ দিনে রচনা প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ সম্পন্ন

বেগম জিয়া স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতীক ছিলেন- মিফতাহ সিদ্দিকী

১০

৬ষ্ঠ আলোর অন্বেষণ বইমেলার দ্বিতীয় দিনে কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে আলোচনা ও কবিতা পাঠ অনুষ্ঠিত

১১

সাহিত্য সাংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধনে বইমেলা কার্যকর ও মহৎ উদ্যোগ-মিফতাহ সিদ্দিকী

১২

সিলেটে ১০ দিনব্যাপী ৬ষ্ঠ আলোর অন্বেষণ বইমেলা শুরু আগামীকাল

১৩

ম্যানচেস্টার-সিলেট ফ্লাইট অব্যাহত দাবিতে প্রবাসী বাংলাদেশী ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের স্মারকলিপি

১৪

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করলেন বদরুজ্জামান সেলিম

১৫

বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে বিএনপি মিশিগান শাখার আয়োজনে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত

১৬

বেগম জিয়া গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও মানুষের ভোটাধিকার রক্ষার এক আপসহীন প্রতীক- মিফতাহ সিদ্দিকী

১৭

বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করলেন মিফতাহ সিদ্দিকী

১৮

একুশে পদকপ্রাপ্ত ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া আর নেই

১৯

সিলেট প্রেসক্লাবের নির্বাচন সম্পন্ন: সভাপতি মুকতাবিস-উন-নূর, সম্পাদক সিরাজ

২০