১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিন। অথচ এই দিনে শহীদ মিনারের দিকে পা বাড়াতে কখনও কখনও দ্বিধা জাগে। কারণ যারা এই দেশকে ভালোবেসে জীবন উজাড় করেছিলেন, তাদের রক্ত-স্নাত আত্মত্যাগের মর্যাদা আমরা জাতি হিসেবে পুরোপুরি রক্ষা করতে পারিনি, এই বেদনা আজও তাড়া করে ফেরে।
তবুও সংগঠনের দায়বদ্ধতায়, সামাজিক আচার পালনে, আমরা অনেকেই ফুল হাতে শহীদ মিনারে দাঁড়াই। কিন্তু অন্তরের গভীরে যে আত্মতৃপ্তির আলো জ্বলে ওঠার কথা, স্বাধীনতার আজকের দৈন্যদশায় তা যেন নিভু-নিভু হয়ে আসে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিভাজন, লোভ-হিংসা, দুর্নীতি, ঘুষ, গুম-খুন-এ সবকিছু এমনভাবে আমাদের জাতীয় জীবনে ছড়িয়ে পড়েছে যে শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর মুহূর্তটি মাঝে মাঝে তাদের সঙ্গে প্রহসন বলে মনে হয়।
আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরবগাঁথা অর্জন নিয়ে অহংকার করি, বিজয়ের উল্লাস করি, শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘে ভরাই। অথচ তাদের দেশপ্রেম, আদর্শ, নৈতিকতা, চেতনার মূল ভিত্তি এখনও আমরা ধারণ করতে পারি না।
স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে নিজেদের বদলাই না, সমাজের কল্যাণে সামর্থ্যের শেষটুকু ঢেলে দিই না, ব্যক্তিস্বার্থকে পায়ের নিচে রাখার সাহস দেখাই না। সবুজ লাল রঙা পতাকা উড়িয়ে এক দিনের দেশপ্রেম দেখাই, কিন্তু বাস্তবায়ন করতে পারি না মুক্তির স্বপ্ন, বিজয়ের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য।
স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য ৫৫ বছর আগে যার জন্য উদিত হয়েছিল, সেই সূর্যের আলো আজও ম্লান। অরক্ষিত সীমান্ত, বাংলার আকাশে বিদেশী শকুনের নগ্ন হস্তক্ষেপ, গুম-খুনের অজানা আতঙ্কিত জনজীবন, দুর্নীতি-ঘুষ, স্বজনপ্রীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, দুঃসহ দ্রব্যমূল্য,অনিয়ম-অসংগতি, সব মিলিয়ে স্বাধীনতার অর্জন যেন প্রশ্নবিদ্ধ।
গণতন্ত্রের ওপর আয়রন-বুট, বিচার বিভাগের অবরুদ্ধ যাত্রা, বাকস্বাধীনতার শ্বাসরোধ এসব দেখে মনে হয় আমরা কি সত্যিই স্বাধীন?
নাকি অপশাসনের নতুন এক অধ্যায়ে বন্দি?
বিদেশি বিনিয়োগের নামে বহুজাতিক বেনিয়া কোম্পানিগুলো দেশীয় অর্থনীতির স্বার্থ হাতিয়ে নিচ্ছে,তারুণ্যের উদ্যম গতি থমকে দাঁড়িয়েছে মোবাইল-ফ্যাশন আর ভার্চুয়াল ঘোরে। নীতিনির্ধারকদের মাথায় মাছের মাথা-পচনের গন্ধ, সুশীল সমাজের চোখে টিনের চশমা, সব মিলিয়ে দেশ যেন এক গভীর অন্ধকারের হাতছানিতে।
এই চরম ক্রান্তিলগ্নে বিজয় দিবস উদযাপন কতটা অর্থবহ এই প্রশ্ন বারবার আঘাত হানে মনে।
সত্যিকার অর্থে আমরা কি স্বাধীনতার আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পেরেছি?
স্বাধীনতা কি কেবল স্মারক দিবস আর ফুল অর্পণের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ?
ইতিহাসের পথ ধরে আরও যেসব প্রশ্ন মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে-
কেনো আমরা এখনো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত?
কেনো ভোট ও ভাতের অধিকার রক্ষায় প্রতিদিন সংগ্রাম করতে হয়?
কেনো মুক্তিযোদ্ধার তালিকা নিয়ে প্রহসন চলে বারবার?
কেনো স্বাধীনতার সত্য ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে বিকৃত করে পরিবেশন করা হয়?
কেনো দেশের স্বাধীনতা আজও অন্যের ইশারায় পুতুলের মতো দোদুল্যমান?
ফেলানীর দেহ সীমান্তে ঝুঁলে থাকে, আর আমরা লজ্জার নিঃশ্বাস গিলে কেবল তাকিয়ে থাকি।
তখন মনে প্রশ্ন জাগে এটাই কি সেই বাংলাদেশ?
যে দেশ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে পৃথিবীর কাছে মাথা উঁচু করেছিল,ছিনিয়ে এনেছিল বিজয়ে রক্তিম প্রভাত।
ভেতরে ভেতরে লজ্জার আগুন জ্বলে ওঠে।
যে দেশে মানুষ সত্য কথা বলার স্বাধীনতা পায় না, যেখানে বিচার স্বাধীন নয়, গণতন্ত্র পুলিশি বুটের নিচে পিষ্ট সেই দেশের মানুষ কোন মুখে বিজয় উদযাপন করবে?
যে জাতি স্বাধীনতার রক্তিম উত্তরাধিকার রক্ষা করতে জানে না সে জাতির আনন্দ কি সত্যিই বিজয়ের আনন্দ?
তবুও মনের গভীর থেকে একটি স্বপ্ন মাথা তোলে একদিন নিশ্চয়ই বদলে যাবে সব।
একদিন সত্যিকার স্বাধীনতার আলোয় আলোকিত হবে আমার প্রিয় বাংলাদেশ।
শহীদের আত্মত্যাগের কাছে আমরা দায়মুক্ত হবো, আর বুকভরা গর্বে উচ্চারণ করবো, আমরা স্বাধীন জাতি। আমাদের স্বাধীনতা কারও দয়া নয় অর্জিত লক্ষ প্রাণের অমূল্য রক্তে।
জন্মদিনে তাই প্রিয় বাংলাদেশকে জানাই গভীর শুভেচ্ছা।
তোমার সন্তানরা একদিন নিশ্চয়ই সব অন্ধকার পেরিয়ে দাঁড়াবে আলোর মাঠে,
এই বিশ্বাসই আজ আমার শক্তি, আমার স্বপ্ন, আমার দেশপ্রেমের শেকড়।
নতুন সম্ভাবনার দীপ্ত হাতছানি আশান্বিত করে তবুও এক অজানা ভয় ৭১ এর পরাজিত শক্তি কখনও নীরবে কখনও স্বরবে পরাজয়ের বদলা নিতে ফন্দি ফিকিরে মত্ত। দেশের ক্রান্তিকাল অতিক্রমে প্রতিবন্ধক অদৃশ্য শক্তি ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে।সজাগ থেকে প্রজন্ম আর একবার হারালে এই দেশ আর কখনও ফিরে পাবে না।
বিজয়ের দীপ্ত শপথ হউক সকল অশুভ শক্তির নাশ করে বীরদর্পে এগিয়ে যাবে রক্তের দামে কেনা প্রিয় জন্মভূমি।৭১ এর পরাজিত শক্তি যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে প্রজন্ম হউক তার অতদ্র প্রহরী।
ভালো থেকো বাংলাদেশ-
আমাদের ভালো রাখো।
আমরা আজন্ম তোমার কাছে ঋণী।
মন্তব্য করুন