সাজন আহমদ সাজু
৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ৩:১৪ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া’র জন্ম ও মৃত্যু দিবস আজ

এক শতাব্দী আগে, যখন পৃথিবীর আকাশে নারীর স্বপ্ন দেখার অধিকারও ছিলো সীমাবদ্ধ, তখন বেগম রোকেয়া কল্পনার ডানায় আঁকলেন এমন এক ভবিষ্যৎ, যার সৌরভ আজও আমাদের বাতাসে ছড়িয়ে আছে। তাঁর কল্পনায় ছিলো এক অপরাধহীন সমাজ মানবিকতা ও মমতার নির্মল জলধারা যেখানে প্রবাহিত হবে অবিরাম। যে দিগন্ত তিনি দেখেছিলেন, সেই দিগন্ত আজ অনেকটাই বাস্তব, কিন্তু সে পথে পৌঁছাতে তাঁকে পেরোতে হয়েছিল সামাজিক শত প্রতিকূলতা, বাধা, ব্যঙ্গ সবই।

১৯০৫ সালে প্রকাশিত তাঁর অনন্য রচনা ‘সুলতানার স্বপ্ন’ রোকেয়ার মননজগতের উজ্জ্বলতম প্রতিধ্বনি। সেখানে তিনি নির্মাণ করেছিলেন এক আশ্চর্য ভুবন ‘নারীস্থান’। নেতৃত্ব, প্রজ্ঞা, বিজ্ঞান, রাষ্ট্র সবকিছুই পরিচালিত নারীর হাতে। সেই জগতে নারী বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেন উড়ন্ত রথ, আবহাওয়ার খেয়াল বদলে দেওয়ার প্রযুক্তি, সৌরশক্তিনির্ভর অসীম সম্পদ আর স্বয়ংক্রিয় কৃষির জাদু। সেখানে মানুষ শ্রমে নয়, বুদ্ধি ও বিজ্ঞানেই সমৃদ্ধ। এই কল্পবিজ্ঞান শুধু কল্পনা নয়, ছিল রোকেয়ার সুস্পষ্ট সামাজিক স্বপ্ন এক সমতাপূর্ণ সভ্যতার ঘোষণা।

১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর এক প্রাচীন জমিদার বংশে তাঁর জন্ম। তখনকার দিনের নারীরা ছিলেন অন্তরালে, শিক্ষাবঞ্চিত। কিন্তু রোকেয়ার বড়ো ভাই সেই অভ্যস্ত অন্ধকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক সাহসী আলোকবাহী চেয়েছিলেন তাঁর বোন যেনো শিক্ষার আলোতে জেগে ওঠেন। ভাইয়ের হাত ধরেই রোকেয়ার প্রাথমিক শিক্ষার যাত্রা শুরু।

বিয়ের পর তাঁর জীবনে প্রবেশ করেন আরও এক আলোকপুরুষ উদারমনা স্বামী ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন। তাঁর স্নেহ, উৎসাহ ও শিক্ষা রোকেয়ার প্রতিভাকে নতুন বিস্তারে পৌঁছে দেয়। তিনি উর্দু ও ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন করেন এবং প্রবেশ করেন সাহিত্যের পরম বাগানে। ১৯০২ সালে ‘পিপাসা’ রচনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর লেখকজীবন যেনো একফোঁটা জল অদ্ভুত বেগে নদীতে পরিণত হবার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নারীশিক্ষার অগ্রযাত্রা রোকেয়ার কর্মজীবনে সবচেয়ে দীপ্ত অধ্যায়। ১৯০৯ সালের ১ অক্টোবর ভাগলপুরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’। প্রথম দিন একটি বেঞ্চ, পাঁচজন ছাত্রী আর তাঁর অবিচল বিশ্বাস। মুসলিম নারীশিক্ষাকে তখন সমাজ দেখত সন্দেহের চোখে; রোকেয়া তাই নিজে বোরকা পরে ঘরে ঘরে গিয়ে ছাত্রী সংগ্রহ করেন। কিন্তু প্রচণ্ড বিরোধিতা তাঁকে বাধ্য করে ভাগলপুর ছেড়ে আসতে।

তারপর শুরু হয় তাঁর দ্বিতীয় যাত্রা কলকাতায়। শহর তাঁর কাছে ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত, কোনো স্বজন নেই, পরিচিত মুখ নেই। তবু তিনি আবার শুরু করেন স্কুলটি এবার দুটো বেঞ্চ, আটজন ছাত্রী। প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নেই, কোনো চাকরির অভিজ্ঞতা নেই, তবু তিনি একাই সামলালেন বিরাট দায়িত্ব। মনে হয় যেন সমাজের অন্ধকার প্রান্তে তিনি একা হাতে জ্বালিয়েছিলেন আলো যার দ্যুতি আজও থামেনি।

অর্থনৈতিক সঙ্কটকেও রোকেয়া ভয় পাননি। ১৯১৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘আনজুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ পরবর্তীতে যা পরিচিত হয় ‘মহিলা সমিতি’ নামে। নারীর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করতে গিয়ে তাঁকে সম্মুখীন হতে হয়েছে অগণিত প্রতিকূলতার। কিন্তু তাঁর মন ছিল অটুট। তাই তিনি সহকর্মীদের বলেছিলেন, সমাজের কাজে নামলে গায়ের চামড়া এমন পুরু করতে হবে, যেন নিন্দা-অপমানের কোনো তীরই ভেদ করতে না পারে মাথাকেও করতে হবে এমন দৃঢ়, যেন ঝড়-বজ্রপাত এসে তাতে প্রতিহত হয়ে ফিরে যায়।

এই উক্তিটি শুধু তাঁর ভাষা নয় ছিলো তাঁর চরিত্রের নির্মল প্রতিচ্ছবি।
রোকেয়ার কর্মজীবন ছিলো নিরলস। দিনশেষে যিনি লেখার টেবিলে বসে রাত কাটাতেন, তিনি জীবনের শেষ রাতেও সেই অভ্যাস থেকে সরে যাননি। তাঁর শেষ রাত ছিল কলম আর দায়িত্বে ভরা। ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর
যেদিন তাঁর জন্ম সেই দিনেই তিনি বিদায় নেন পূর্ণতার নীরবতায়।
তাঁর শেষ অসমাপ্ত লেখা ছিল ‘নারীর অধিকার’। যেনো শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তাঁর হৃদয়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিলো নারী, শিক্ষা, স্বাধীনতা ও অগ্রগতি।

প্রতি বছরের মতো আজও পালিত হচ্ছে বেগম রোকেয়া দিবস স্মরণে, শ্রদ্ধায়, আলোচনায়, প্রত্যয়ে। এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন মানুষের স্বপ্ন কীভাবে একটি সমাজকে বদলে দিতে পারে কীভাবে এক নারীর কলম পৃথিবীর অন্ধকারে হাজার দিশা জ্বালাতে পারে।

বেগম রোকেয়া স্বপ্নের দিগন্তে এক চিরন্তন উষা, সমতার প্রতীক, মানবতার দীপশিখা।
তাঁর পথচলা আমাদের জন্য শিখা হয়ে থাকুক যুগের পর যুগ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

করবো কাজ গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ- তারেক রহমান

সিলেটে ১০ দিনব্যাপী ৬ষ্ঠ আলোর অন্বেষণ বইমেলা সমাপ্ত

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান: স্বাধীনতার ঘোষক থেকে রাষ্ট্রনায়ক- সাজন আহমদ সাজু

আলোর অন্বেষণ সাহিত্য পদক-২০২৫ প্রদান অনুষ্ঠান সম্পন্ন

৬ষ্ঠ আলোর অন্বেষণ বইমেলার ৭ম দিনে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ সম্পন্ন

৬ষ্ঠ আলোর অন্বেষণ বইমেলার ষষ্ঠ দিনে স্কুল শিক্ষার্থীদের সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা

“আলোর অন্বেষণ সাহিত্য পদক ২০২৫” গবেষণায় পদক পাচ্ছেন গবেষক তাবেদার রসুল বকুল

আলোর অন্বেষণ সাহিত্য পদক ২০২৫ “আজীবন সম্মাননা” পাচ্ছেন কবি ও গবেষক দেওয়ান এ এইচ মাহমুদ রাজা চৌধুরী

৬ষ্ঠ আলোর অন্বেষণ বইমেলার চতুর্থ দিনে রচনা প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ সম্পন্ন

বেগম জিয়া স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতীক ছিলেন- মিফতাহ সিদ্দিকী

১০

৬ষ্ঠ আলোর অন্বেষণ বইমেলার দ্বিতীয় দিনে কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে আলোচনা ও কবিতা পাঠ অনুষ্ঠিত

১১

সাহিত্য সাংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধনে বইমেলা কার্যকর ও মহৎ উদ্যোগ-মিফতাহ সিদ্দিকী

১২

সিলেটে ১০ দিনব্যাপী ৬ষ্ঠ আলোর অন্বেষণ বইমেলা শুরু আগামীকাল

১৩

ম্যানচেস্টার-সিলেট ফ্লাইট অব্যাহত দাবিতে প্রবাসী বাংলাদেশী ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের স্মারকলিপি

১৪

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করলেন বদরুজ্জামান সেলিম

১৫

বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে বিএনপি মিশিগান শাখার আয়োজনে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত

১৬

বেগম জিয়া গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও মানুষের ভোটাধিকার রক্ষার এক আপসহীন প্রতীক- মিফতাহ সিদ্দিকী

১৭

বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করলেন মিফতাহ সিদ্দিকী

১৮

একুশে পদকপ্রাপ্ত ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া আর নেই

১৯

সিলেট প্রেসক্লাবের নির্বাচন সম্পন্ন: সভাপতি মুকতাবিস-উন-নূর, সম্পাদক সিরাজ

২০